একাকী এভারেস্ট ছোঁয়ার ৪০ বছর

আজ থেকে ঠিক বছর আগে ১৯৮০ সালের ২০ই আগস্ট ইতালিতে জন্ম নেয়া পর্বতারোহনের দর্শন চিরদিনের মতো পাল্টে দেয়া পর্বতারোহী রেইনহোল্ড মেসনার প্রথমবারের মতো একাকী আরোহণ করেছিলেন পৃথিবীর ছাদ – মাউন্ট এভারেস্ট। ভরা বর্ষায় এভারেস্ট যখন ধূধূ মরুভূমি তখন তিব্বতের দিক থেকে অর্থাৎ উত্তর দিক থেকে সম্পূর্ণ একা, কৃত্রিম অক্সিজেন সহায়তা ছাড়া উত্তর-পূর্ব রিজ দিয়ে নতুন এক রুটে তিনি রচনা করেছিলেন এই মহাকাব্যের, যা ততোদিন পর্যন্ত কেউ সম্ভব বলেই ভাবেনি। মাসখানেক অতি উচ্চতায় অভিযোজিত হয়ে  ১৮ই আগস্ট বেরিয়ে, এক ফাটলে পরে গিয়ে ৩ দিন পর খারাপ আবহাওয়াতে তিনি চূড়ায় পৌঁছেছিলেন। তিনি যখন বেসক্যাম্পে ফিরে এসেছিলেন সেই সময়কার অবস্থা নিয়ে তাঁর প্রেয়সী নিনা হল্গুইন ডায়েরীতে লিখেছিলেন “দেখে মনে হচ্ছিল কোল থেকে কোন মাতাল নেমে আসছে। ৪ দিন আগে বের হওয়া ব্যক্তি এবং এই ব্যক্তি মোটেই এক নয়। সে অশ্রুসজল চোখে আমার দিকে চেয়েছিল। তাঁর মুখ হলুদ, ঠোট খসখসে এবং ক্ষত হয়েছিল।”

1980-first-solo-summit-of-mount-everest_tcm25-392926

ছবিঃ অভিযান বর্ণনায় মেসনার

এই কিংবদন্তীর সেই রুপকথার অভিযানের ৪০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জার্মানির সাংবাদিক স্টেফান নেস্টলার। সেই সাক্ষাৎকারে মেসনার তাঁর অভিজ্ঞতার কিছু স্মৃতি, আপ্লাইনিজম ও একাকী আরোহন নিয়ে তাঁর মূল্যবান দৃষ্টিভঙ্গী তুলে ধরেন। পড়ে ফেলুন এর চুম্বক অংশ – বাংলায়।

আপনি কি এখনো মাঝে মাঝে ১৯৮০ সালের ২০ই আগস্ট একাকী এভারেস্টে সামিটে পৌঁছানোর কথা ভাবেন?

এখনো এর দশ বছর আগের নাঙ্গা পর্বত  নিয়ে যতটা ভাবায় তার চেয়ে অনেক কম। ৫০ বছর আগে সেখানে আমার ভাইয়ের মৃত্যু আমাকে এভারেস্ট একাকী আরোহনের চেয়ে অনেক গভীরভাবে নাড়া দেয়। এভারেস্ট একাকী আরোহন ছিল ১৯৭০ এ নাঙ্গা পর্বত১৯৭৫ এ হিডেন পিক (গাশারব্রাম-১)১৯৭৮ এ কৃত্রিম অক্সিজেন ছাড়া এভারেস্ট এবং একাকী নাঙ্গা পর্বত এবং ১৯৭৯ এ কে-টু ধরে চলা আমার অগ্রযাত্রার চূড়ান্ত ধাপ। এরপর আমি সবকটি আটহাজারী শৃঙ্গ আরোহন শেষ করার দৌড়ে লেগে যাই।

1970: Günther (left) and Reinhold Messner in the Nanga Parbat .

ছবিঃ ১৯৭০ এ নাঙ্গা পর্বত অভিযানে ভাই গুন্থার মেসনারের সাথে রেইনহোল্ড মেসনার।

আপনার বইয়ে এভারেস্ট একাকী আরোহন সম্পর্কে লিখেছেন ” এটি এক অন্তহীন নির্যাতন”। ওই সময় আসলেই কতটা বিক্ষিপ্ত ছিলেন?

১৯৮০ সালের এভারেস্টে যতটা বিক্ষিপ্ত ছিলাম এর আগে পরে কখনোই অতটা হইনি। দারুন আবহাওয়া ছিলভালোমতো অভিযোজিত ছিলাম এবং নিচের অংশে দ্রুত এগিয়েছিলাম। এটি আমাকে উল্লসিত এবং আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছিল। সামিটের কয়েকশ মিটার নিচে আবহাওয়া খারাপ হয়ে যাচ্ছিল। মেঘ হামাগুড়ি দিয়ে দক্ষিণ দিক থেকে এসে উত্তর দিকের সামিটকেও ঢেকে ফেলেছিল। হঠাৎই দিক হারিয়ে ফেলার ভয় আমাকে গ্রাস করছিল। তুষারপাত চলছিল ক্রমাগত। যদি আমি তুষারের মাঝে হালকা দেখতে পাওয়া আমার ফেলে আসা পথ খুঁজে না পেতাম আমি উপরেই হারিয়ে যেতাম। তাই আমি দ্রুত আরোহনের চেষ্ঠা করছিলাম। কিন্তু ওই জায়গায় বাতাসে অক্সিজেনের পরিমান কম থাকায় তা সম্ভব হচ্ছিল না। একদিকে ছিল বিপদের ভয়অন্যদিকে হালকা বাতাস আমার গতি ক্রমাগত শ্লথ থেকে আরো শ্লথ করে দিচ্ছিলো। সামিটে এতটাই ক্লান্ত ছিলাম যে আমি নিজেকে তুষারে সপে দিলাম এবং ঝিমুতে থাকলাম। সৌভাগ্যক্রমে একঘন্টা হাঁফানোর পর আমি আবার দাঁড়িয়ে নামা শুরুর শক্তি পেয়েছিলাম।

আপনার একাকী এভারেস্ট আরোহন হিমালয়ে পর্বতারোহণের একটি মাইলফলক। আপনি কি ক্যারিয়ারে এই অভিযানকে চরমসীমা হিসেবে বিবেচনা করেন?

না। নাঙ্গা পর্বত একাকী আরোহন এরচেয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একাকী ৮০০০ মিটার পর্বত অভিযানের মহাযজ্ঞে এটিই প্রথম পদক্ষেপ। নিজের আতংক এবং ভয়কে অন্যের সাথে ভাগ করতে না পারাটাই কঠিন। একজন সহযাত্রী থাকলে পুরো ব্যাপারটাই আবেগ এবং মনস্তাত্ত্বিকভাবে বহন করা অনেক সহজ হয়ে যায়। কিন্তু একাকী হলে ভিতরটা ক্রমাগত চূর্ন-বিচূর্ণ হতে থাকে। এই পাতলা বাতাসঊর্ধ্বশ্বাসফুসফুস ভোরে দেয়া ঠান্ডা বাতাসঅনেক যন্ত্রণাদায়ক। এটা অনুভব করতে হলে আপনাকে নিজে ভুগেই অনুভব করতে হবে। এভারেস্ট একাকী আরোহন সবচেয়ে কঠিন না হলেও সামিটের দিন ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে ক্লান্তিকর। এরপর আমি ওই মেঘাচ্ছন্নতা থেকে বেরিয়ে আসি। বর্ষায় জমা তুষারের মাঝ দিয়ে নেমে আসাটা উঠার চেয়ে অনেক কম ক্লান্তিকর।

এটাই আজ পর্যন্ত এভারেস্টে একমাত্র সফল একাকী আরোহন অভিযান। আপনার মতে এটা কেনো হলো?

অবশ্যই কিছু লোক এই ঢালে একাকী উঠা-নামা করেছে। কিন্তু তাঁদের সামনে ছিল ৫০ জনপিছনে ১০০ জন। এদের মাঝে ছিল এলিসন হারগ্রিভস, যে আমার মতে সর্বকালের সেরা নারী পর্বতারোহী। কিন্তু  এটাও সত্যিকারের একাকী আরোহন ছিলোনা। একাকী আরোহন করতে আমি পর্বতের পাশে সম্পূর্ণ একাকী যেতাম। এটাই সবচেয়ে কঠিনকারণ আমরা মানুষেরা একাকী থাকার জন্য তৈরী হইনি। ডোলোমাইটসের দেয়ালে একরাত বিভোয়াক করে পরদিন আরোহন করা তুলনামূলক সহজ। আমাকে সেটাও শিখতে হয়েছে। কিন্তু ওই গহীনে একাকী গিয়ে বাকি পৃথিবী থেকে সপ্তাহের পর সপ্তাহ বিচ্ছিন্ন থাকা অনেক বেশি কঠিন। এটা সহ্য করা আসলেই দূরহ কাজ।

গত শীতে জার্মানির হস্ট কবুশ এভারেস্টের পশ্চিম দেয়াল দিয়ে কৃত্রিম অক্সিজেন সহায়তা ছাড়া একাকী আরোহনের চেষ্টা করেছিলেন। তিনি প্রায় ৭৪০০ মিটার পর্যন্ত পৌঁছান। আপনার কি মনে হয় শীতে একাকী আরোহন বাস্তবসম্মত?

হ্যাঁকিছু পর্বতারোহী আছেন যারা এই চ্যালেঞ্জ নেয়ার সক্ষমতা রাখেন। কিন্তু একটা ব্যাপার নিশ্চিত যে কবুশ তাঁদের একজন নয়। তাঁর বিন্দুমাত্র ধারণাই ছিলোনা বা খুবই কম ধারণা ছিল যে সে আসলেই কি করছে। তাঁর মতে তাঁর পাড়ি দেয়া লো-লা দিয়ে ৫০০ বছর আগে শেরপারা তিব্বত থেকে নেপালে এসেছে, যা আসলে সম্ভবই নয়। তাঁরা এসেছিল নাঙ্গপা-লা দিয়ে। কেউ যদি এটাই না জানেবলা যায় যে তাঁর এভারেস্টের ঐতিহাসিক এবং ভৌগোলিক কোন ধারণাই নেই।

এই বসন্তে এভারেস্ট একাই থেকে গেলো। এতোদিন ধরে সবাই আবেদন করেও সামিট প্রার্থীর সংখ্যা কমাতে ব্যার্থ হলেও করোনা তা সম্ভব করেছেন।আপনার কি মনে হয় এর একটা দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব থাকবে?

দুঃখজনক ভাবে এর কোন দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব নেই। জীবিকার জন্য এই কাজ করার কারণে শেরপাদের এটা প্রয়োজন। সামনে ২৫০০০/- করার ব্যাপারে আলোচনা হলেও সরকার বর্তমানে অনুমতি প্রতি ১১০০০/- ডলার আয় করে। শেরপারাই এখন এভারেস্ট নিয়ন্ত্রণ করে। হিমালয়ে পথপ্রদর্শনকারী বলতে আমরা যা ভাবতে পারি তার মাঝে তারাই সেরা।  তাঁদের কেউ এক-ডজন অথবা কেউ দুই-ডজনবার এভারেস্ট আরোহন করেছে। এক গুর্খা, নির্মল পূর্জা, শুধু এভারেস্টই সামিট করেনি, সাতমাসের কম সময়ে সামিট করেছে ১৪টি আটহাজারী শৃঙ্গের সবক’টি। কিন্তু এর সবই সম্ভব হয়েছে সবগুলো পর্বতে দড়ি ও শিকল লাগানো থাকার কারণে। পর্যটকদের জন্য পথ এমনভাবে তৈরী যেনো যতজন ইচ্ছা ততজন উপরে তোলা যেতে পারে। এটা অবশ্যই ভালো যে এভারেস্ট এখন একবছর নীরব আছে। কিন্তু ট্যুর অপারেটরদের কাছে এভারেস্টের চাহিদা শীগ্রই বেড়ে যাবে। এবং চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে বাড়বে নিত্যনতুন অফারের যোগান। বেসক্যাম্প এবং উপরে সুযোগ-সুবিধা বেড়ে যাবে এবং এতে সম্ভব হবে আরো অনেক বেশি মানুষের পৃথিবীর ছাদে আরোহন। পছন্দ তাঁদের হলেও এটা প্রথাগত আল্পাইনিজম নয়। প্রথাগত আল্পাইনিজম সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস। কবুশ এটা করতে চাইলেও তাঁর জানা উচিৎ ছিল যে তাঁর যে অভিজ্ঞতা তাতে তাঁর সফলতার কোন সুযোগই ছিলোনা। সে যদি প্রচুর শিখে এবং তোতাপাখির মতো না শিখে আসলেই বুঝতে পারে আল্পাইনিজম কি জিনিস,  তাহলে এই শারীরিক সক্ষমতা নিয়ে কবুশের এভারেস্টে একাকী আরোহন সফল হবার সুযোগ আছে। সর্বকালের সেরা এডভেঞ্চারের গল্প তৈরীর ঘোষণা অনেক সহজ হলেও অতীতে এইরকম অনেক অভিযানই হাস্যকর প্রচেষ্ঠায় রুপান্তরিত হয়েছে।।

You may also like...

No Responses

  1. tlover tonet says:

    I am no longer certain the place you are getting your information, but great topic. I must spend a while studying much more or figuring out more. Thank you for magnificent information I used to be in search of this info for my mission.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *