কারাকোরামের পঞ্চরত্নে গ্রীষ্ম-১৭

কারাকোরামের সুউচ্চ পর্বতমালায় ২০১৭ সালের গ্রীষ্মকালীন মৌসুমের পরিসমাপ্তি ঘটলো কয়েকদিন আগেই। এখন সবার ঘরে ফেরার পালা, আর আমাদের গল্প শোনার। চলুন দেখে নেয়া যাক কান্না-হাসি মিলিয়ে কেমন ছিল কারাকোরামের এই মৌসুম….

হাসি-কান্না-বিভ্রান্তির নাঙ্গা পর্বত…

এই মৌসুমে সবচেয়ে খারাপ সংবাদ এনে দিয়েছে নাঙ্গা পর্বত। স্পেনিশ আলবার্তো জেরাইন এবং আর্জেন্টাইন মারিয়ানো গালোভান এর শক্তিশালী জুটি মাজেনো রিজ দিয়ে নাঙ্গা’র সামিটের প্রথম পুনরাবৃত্তি ঘটাতে গিয়ে চিরতরে হারিয়ে যান।  রোমানিয়ার এলেক্স গাভানের নেতৃত্বে দুইদফা হেলি-রেস্কিউ অভিযান চালিয়েও এই দুই আল্পাইনিস্টের কোন চিহ্ন পাওয়া যায়নি।

এই শোকের সংবাদ ছাড়াও নাঙ্গা পর্বত মৌসুমের সূচনালগ্নেই পরিণত হয় খবরে। অন্যদলগুলো বিভিন্ন পর্বতের বেসক্যাম্পে পৌঁছানোর আগেই সদ্য সমাপ্ত মৌসুমে হিমালয়ের সবচেয়ে সফল দল ড্রিমার্স ডেস্টিনেশন ১১ই জুন নাঙ্গা পর্বতে সামিটে পৌঁছার খবর ছড়িয়ে পরে। ধৌলাগিরি এবং মাকালু সামিটে পৌঁছানোর ফলে অর্জিত এক্লামটাইজেশনের সুবিধা নিয়ে মিংমা গেলজি শেরপা, ৩ শেরপা, ৩ চীনা এবং ১ ইরানিয়ানকে নিয়ে এই কান্ড ঘটান। কিন্ত পরে মিংমা শেরপা জানান যে তাঁরা ৩টি ভিন্ন ভিন্ন শীর্ষবিন্দুতে পৌঁছালেও নাঙ্গা পর্বতের আসল সামিটে পৌঁছানোর ব্যাপারে তিনি নিশ্চিত নন। তাই ৮ জনের এই সামিট হয়নি বলেই ধরে নেয়া যায়। এরপর ৭ই জুলাই লাকপা নুরুকে সঙ্গে নিয়ে কোরিয়ান কিম হং বিন নাঙ্গা পর্বতের সামিটে পৌঁছেন। এটি কিমের একাদশ আটহাজারী পর্বত সামিট এবং এই মৌসুমে নাঙ্গাতে একমাত্র সাফল্য।

কে-২ তে কাটলো ৩ বছরের খরা…

২০১৫ এবং ২০১৬ সালে সামিটহীন কে-২ এবার আর খালি হাতে ফিরিয়ে দেয়নি। কিন্তু সাফল্য সহজ ভাবে ধরাও দেয়নি। পোলিশরা পরবর্তী শীতকালীন অভিযানের পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে এবার এলেও মাস পেরোনোর পূর্বেই অভিযান সমাপ্ত করেন। প্রথমবারের মতো কে-২ তে সম্পূর্ণ স্কি করে নেমে আসার লক্ষ্য নিয়ে আসা আন্দ্রেই বার্গিয়েল এবং সুপরিচিত ডাভো কার্নিকারও ফিরে যান। এমনকি হিমালয়ে সবচেয়ে সফল বাণিজ্যিক দল হিমালয়ান এক্সপেরিয়েন্স এর দলনেতা রাসেল ব্রাইসও সদলবলে বাড়ির পথ ধরেন। সকলেরই অনুমান ছিল আবহাওয়া সামিট উপযোগী নয়। উল্লেখ্য যে এই মৌসুমে কে-২ এর জন্য ৮৫টি পারমিট ইস্যু করা হয়।

k2-ski-lead_h

ছবিঃ কে-২

সবাই চলে যাওয়ায় শুধু বাকি থাকেন মিংমা গেলজি শেরপার নেতৃত্বে ড্রিমার্স ডেস্টিনেশন দলের ১২ জন। অন্যরা যখন পথ দেখতে পাননি তখন মিংমা অনেকটাই নিজের একক সিদ্বান্তে সামিটের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। ২৯ই জুলাই মিংমা গেলজি, দাওয়া গেলজি, চেরিং পেম্বা, নিমা চেরিং, আং চেরিং, লাকপা নুরু, নিমা নুরুকে সাথে নিয়ে সামিটে নিয়ে আসেন ৫ জন বিদেশি পর্বতারোহীকে। এরা হলেন ব্রিটিশ-আমেরিকান ভেনেসা ও’ব্রিয়েন (প্রথম আমেরিকান নারী), আইসল্যান্ডের জন স্নোররি সিগুরজোনসন (প্রথম আইসল্যান্ডার) এবং চীনের আজং,  জাঙ লিয়াং (১৩তম আটহাজারী সামিট) এবং জিং শুয়ে। মিংমা গেলজি শেরপার দূরদর্শিতা ঘুচিয়ে দিলো কে-২ তে ২০১৪ সালের পর হতে লেগে থাকা সামিট খরা। এই সাফল্যের খবরে দল নিয়ে ফিরে আসাকে নিজের ভুল মেনে নিয়ে অবসর গ্রহণের সিদ্বান্ত জানান রাসেল ব্রাইস। 

অস্কার ক্যাডিয়াকের ব্রডপিক..

গত চার বছর ধরে ব্রডপিকের নাম এলেই সাথে আসে অস্কারের নাম। কৃত্রিম অক্সিজেনের সাহায্য ছাড়া সবকটি আটহাজারী শৃঙ্গ জয়ে তাঁর বাকি ছিল শুধুই ব্রডপিক। আর গত তিনবছর ধরে ব্রডপিক বিভিন্ন কারণে রয়ে গেছে তাঁর ছোঁয়ার বাইরে। এবার তাঁর সাথে ছিলেন শীতকালে প্রথমবারের মতো নাঙ্গা পর্বত জয়ী আলী সাদপারা, তুর্কি তুনক ফিন্ডিক এবং আরেক পাকিস্তানী ইউসুফ। এবার প্রথম চেষ্টায় ১০ই জুলাই তাঁরা ৭৯০০ মিটার থেকে নেমে আসেন, দ্বিতীয় চেষ্টায় ১৫ই জুলাই ৬৩০০ মিটার হতে নেমে আসেন। ২৪ ই জুলাই আবার বেসক্যাম্প থেকে যাত্রা শুরু করে ক্যাম্প-২ তে পৌঁছে তাঁরা ১ দিন খারাপ আবহাওয়ার কারণে আটকে থাকেন। ২৬ই জুলাই ক্যাম্প-৩ তে বিকাল কাটিয়ে তাঁরা সামিটের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন এবং ২৭ই জুলাই সামিটে পৌঁছান।

DGyZ34uWAAACZwA

ছবিঃ অস্কার ক্যাডিয়াক

এর মাধ্যমে অস্কার কৃত্রিম অক্সিজেনের সাহায্য ছাড়া ২০তম এবং ৩৮তম ব্যক্তি হিসেবে সবকটি আটহাজারী শৃঙ্গ সামিটের কীর্তি গড়লেন। ফেররান লাটোৱে এই বছরেই প্রথম কাতালান ক্লাইম্বার হিসেবে সবকটি আটহাজারী শৃঙ্গ সামিটের কীর্তি গড়লেও কৃত্রিম অক্সিজেন সাহায্য ছাড়া এই কীর্তি গড়া প্রথম কাতালান অস্কারই। এছাড়াও তিনি কৃত্রিম অক্সিজেন সাহায্য ছাড়া এই কীর্তি ঘটানো ৩য় স্পেনিশ এবং সবমিলিয়ে ৫ম স্পেনিশ। সবকটি হিমালয়ান ক্রাউন জয়ে তাঁর সময় লেগেছে ৩২ বছর ১১ মাস ২০ দিন। 

এছাড়াও রুপার্ট হওয়ার (প্রথম সামিট), হার্বার্ট রেইনার, সোফি লেভান্ড, ফিদা আলী, ক্যারি রোস্টাড এবং আমিন উল্লাহ (পাকিস্তানের ৫টি আটহাজারী শৃঙ্গ জয়ী ৪র্থ পাকিস্তানী), কোবলার-পার্টনার দলের ৩ শেরপা এবং ৩ সদস্য ব্রডপিক সামিট করেন। কে-২ থেকে নেমে আসে এক সপ্তাহের মাথায় ৪ই আগস্ট মিংমা’র দলের ১০ জন ব্রডপিক সামিট করেন।

গাসারব্রাম-১ এর সাউথ-ওয়েস্ট ফেস…

৩০ই জুলাই  কারাকোরাম এনে দেয় হিমালয় ভক্তদের বছরের পর বছর ধরে প্রতীক্ষিত সুসংবাদ। চেক প্রজাতন্ত্রের মারেকে হোলচেক টানা ৫ বছরের চেষ্টার ফসল হিসেবে সাউথ-ওয়েস্ট ফেসের সরাসরি নতুন রুট দিয়ে আরোহন করেন গাসারব্রাম -১ এর সামিটে, সাথী ছিলেন জেনেক হাক।

maxresdefault

ছবিঃ মারেক হোলচেক

ইউক্রেনের এক শক্তিশালী দল একই পরিকল্পনা নিয়ে আসায় তাঁরা শুরুতে একটু চিন্তিত থাকলেও ইউক্রেনীয়রা নিজেদের একজন আঘাত পাওয়ায় অভিযান বাতিল করেন। ভালো আবহাওয়ার জন্য দীর্ঘ অপেক্ষার পর তাঁরা দুইজন ২৪ই জুলাই বেরিয়ে পড়েন বেসক্যাম্প থেকে। এই দেয়াল বিখ্যাত সব অভিযানের সাক্ষী। স্লোভেনিয়ার আন্দ্রেই স্ট্রেমফেলজ এবং নেক জ্যাপ্লটোনিক ১৯৭৭ সালে প্রথম সাউথ-ওয়েস্ট ফেসের কিনারা দিয়ে এক নতুন রুট ওপেন করেন। ১৯৮৩ সালে পোলিশ কুকুঝকা এবং কুর্তাইকা সাউথ-ওয়েস্ট ফেস আরোহন করতে গেলেও শেষ পর্যায়ে তাঁরা দক্ষিণ দিকে সরে গিয়ে ১৯৫৮ সালের আমেরিকানদের রুট দিয়ে আরোহন সম্পন্ন করেন। এরপর ভ্যালেরি বাবানোভ এবং ভিক্টর আফানাসিয়েফ সাউথ-ওয়েস্ট ফেস ধরে নতুন রুট ওপেন করলেও তা ছিল মূল দেয়াল থেকে অনেক ডান দিকে। তখন পর্যন্ত সাউথ-ওয়েস্ট ফেসের ৩০০০মিটারের উপর সরাসরি লাইন ছিল অধরা।

আর সেই অধরাকে জয় করলেন এই চেকদ্বয় ৬দিনের চেষ্টায়, আল্পাইন স্টাইলে। ২৫শে এবং ২৬শে জুলাই সব চলছিল পরিকল্পনা মাফিক। প্রথমদিনে তাঁরা পৌঁছেছিলেন ৬৮০০ মিটারে এবং অপ্রত্যাশিত তুষারপাতের পরেও দ্বিতীয় দিনে পৌঁছালেন ৭৪০০ মিটারে। তৃতীয় দিনে ৭৯০০ মিটারে পৌঁছার পরিকল্পনা থাকলেও তাঁদের ওই স্থানে পৌঁছাতে লেগে যায় আরও তিন দিন। তুষারের সাগর ঠেলে, সব বাধা পেরিয়ে ২৯শে জুলাই অপ্রত্যাশিতভাবে সামিটের মাত্র ৪০ মিটার নিচে তাঁরা বিভোয়াক করেন এবং ৩০ই জুলাই সামিটে পৌঁছান।

সাউথ-ওয়েস্ট ফেসে মারেকের প্রথম অভিযান ছিল ২০০৯ সালে চেক মাউন্টেনিয়ারিং ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট জেনেক হার্বির মতো অভিজ্ঞ পর্বতারোহীর সাথে। ওই অভিযানে হার্বি ৭৫০০ মিটারে অসুস্থ হয়ে গেলে মারেক অনেক কষ্টে তাঁকে নামিয়ে নিয়ে আসেন। ২০১৩ সালে দু’জনে আবারো আসেন একই উদ্দেশ্যে। কিন্তু এবারের ঘটনা ছিলো আরোও ভয়াবহ। হার্বি ৬৮০০ মিটার উচ্চতা থেকে পরে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেন। একবছর অপেক্ষার পর মারেক ২০১৫ সালে টমাস পেট্রেচেক কে সাথে নিয়ে আবারো অভিযানে আসেন। ৭৩০০ মিটার উচ্চতায় তাঁদেরকে ভয়াবহ আবহাওয়া পেয়ে বসে। শূণ্যের ৩০ ডিগ্রী নিচের তাপমাত্রা, প্রচন্ড বাতাসের মাঝেই ওই উচ্চতায় তাঁরা এক সপ্তাহ আটকে থাকার পর শেষ পর্যন্ত সৌভাগ্যক্রমে জীবিত ফিরে আসেন। কিন্তু এতো ভয়াবহ অভিজ্ঞতাও দমাতে পারেনি মারেককে। তিনি ২০১৬ সালে অন্ড্রা মান্ডুলাকে সাথে নিয়ে। কিন্তু এবারের অভিজ্ঞতা আরোও ভয়ানক। দুইজনই ৭৭০০ মিটার উচ্চতায় কোন খাবার, পানি, জ্বালানী ছাড়াই আটকে পরেন খারাপ আবহাওয়ার কারনে। ৯ই আগস্ট বেসক্যাম্প থেকে যাত্রা করে ফিরে আসেন তাঁরা ২২ই আগস্ট, অর্থাৎ বরাবর ১৪ দিন পর!

গাসারব্রাম-২ এ উদ্বারাভিযান…

আলবার্তো ইনুরাতেগী, হুয়ান ভাল্লেজো এবং মাইকেল জাবালজা আবারো গিয়েছিলেন ৬৫০০ মিটারের নিচে না নেমে গাসারব্রাম-১ এবং গাসারব্রাম-২ ট্রেভার্স করার জন্য। কিন্তু গাসারব্রাম-১ এ অবস্থা খারাপ দেখে তাঁরা গাসারব্রাম-২ থেকে গাসারব্রাম-১ এর দিকে এগুনোর পরিকল্পনা করেন। কিন্তু এই প্রজেক্ট শেষ করার মতো ভালো আবহাওয়া না থাকায় তাঁরা ১০ই জুলাই তাঁদের প্রজেক্টের সমাপ্তি ঘটান। এই তিনজন অবশ্য ফিরে আসার সময় বেসক্যাম্পে সবকিছু গুছিয়ে নেয়ার সময় আবারো ক্যাম্প-৩ এ গিয়ে ইতালিয়ান ভ্যালেরিও আননোভেজ্জিকে উদ্বার করেন।

এর আগে ১৬ই জুলাই ফ্রেঞ্চ গাইড ম্যাথিউ হাইনডিয়ার এবং জেরেমি রোমেবি এবং আমেরিকান কলিং হালেই গাসারব্রাম-২ সামিট করেন। 

জাদুকর মিংমা…

এই মৌসুমের কেন, এই বছরের সেরা ক্লাইম্বার হলেন নিঃসন্দেহে মিংমা গেলজি শেরপা। ব্রডপিকের মাধ্যমে তিনি ১৪টি আটহাজারী পর্বতের মধ্যে ১১টি সামিটের অধিকারী হলেন, যার মধ্যে ১০টিই হলো কৃত্রিম অক্সিজেনের সাহায্য ছাড়া। এই বছর তিনি ৫টি ভিন্ন পর্বতে ৮হাজার মিটার উচ্চতা অতিক্রম করেছেন। ৩০ই এপ্রিল ধৌলাগীরি (৮১৬৭ মিটার), ১১ই মে মাকালু (৮৪৮৫ মিটার), ১১ই জুন নাঙ্গা পর্বত (৮১২৫ মিটার; সামিট হয়নি), ২৯শে জুলাই কে-২ (৮৬১১ মিটার) এবং ৪ই আগষ্ট ব্রডপিক (৮০৫১ মিটার)।

mingma-g-Gyalje-Sherpa-portret

ছবিঃ মিংমা গেলজি শেরপা

এবছরের সাফল্য গুলি ছাড়াও তাঁর ঝুলিতে রয়েছে ৫ বার এভারেস্ট, ৩ বার মানাসলু, কাঞ্চনজঙ্গা, লোৎসে, চৌ-ইয়ু, অন্নপূর্ণা-১, গাসারব্রাম-১, যার মধ্যে শুধু এভারেস্টেই তিনি কৃত্রিম অক্সিজেনের সাহায্য নিয়েছিলেন।

অন্যান্য পর্বতে…

এই মৌসুমে ইতালিয়ান একদল আল্পাইনিস্ট প্রথমবারের মতো আরোহণ করেন পাকিস্তানের ৬১৭৭ মিটার উচ্চতার এক পর্বত, যার নাম তাঁরা রাখেন “জিন্নাহ পিক”চিলিয়ানরা প্রথমবারের মতো আরোহণ করেন এক ৬২৭০ মিটার উচ্চতার পর্বতে, যার নাম তাঁরা রাখেন “মিরচি পিক”। এছাড়াও ৭০৫০ মিটার উচ্চতার প্রাকপা রি এর দক্ষিণ সামিট প্রথম সামিট হলো এই মৌসুমে।

…………………………………………………………………………………………………

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *