কিলিয়ান ইফেক্ট ও পাঁচ স্তর

কিলিয়ান জর্নেট – দ্রুত আরোহণের কারণে পর্বতারোহন জগতের এক সুপরিচিত মুখ। এই বছর এভারেস্টে তিনি যা করলেন তা তাঁর খ্যাতিকে পৌঁছে দিয়েছে ভিন্ন উচ্চতায়। বিভিন্ন পর্বতে তাঁর বিভিন্ন অর্জনের সাথে সাথে বেড়ে চলেছে তাঁর অনুসারী দল। কিন্তু খ্যাতির সাথে সাথে তাঁকে দেখতে হচ্ছে মুদ্রার অপর পিঠ- খ্যাতির বিড়ম্বনা। সম্প্রতি সপ্তাহখানেকের মধ্যে কিলিয়ানের ন্যূনতম রসদ এবং ন্যূনতম পোশাকের ধরণ অনুসরণ করে মাউন্ট ব্লা আরোহন করতে গিয়ে মারা যান ভিন্ন ভিন্ন ঘটনায় দুই তরুণ। আর তাঁদের মৃত্যুর দায়ভার বিভিন্ন মহল চাপিয়ে দিচ্ছে কিলিয়ানের উপর। তরুণদের এই উদ্দামের নামও হর্তাকর্তারা দিয়েছেন “কিলিয়ান ইফেক্ট”। তাই তরুণদের সতর্ক করতে এবং করণীয় সম্পর্কে জানাতে চেষ্ঠা করেছেন কিলিয়ান, যাকে তিনি পাঁচটি স্তরে ভাগ করেছেন। আমাদের দেশের যেসব তরুণ পর্বতারোহণকে ঘিরে লাল-নীল স্বপ্নের বীজ বুনে চলেছেন তাঁদের অবশ্যই জেনে নেয়া উচিত এই পাঁচ স্তর…

ভাবতেই ভালো লাগে যে আমি কিছু মানুষকে অন্তত: প্রকৃতির কাছে যেতে অনুপ্রাণিত করতে পেরেছি। কারণ আমার মনে হয় যারা শহুরে জীবনযাপন করে এবং ইট-পাথরের জঙ্গলে বসবাস করে, তাঁদের থেকে প্রকৃতির সান্নিধ্যে যাওয়া মানুষের স্বাস্থ্য অনেক ভালো থাকে, পরিবেশকে ভালো বুঝতে পারে এবং কিছু নৈতিকতা ও মূল্যবোধ জাগ্রত হয়। কিন্তু পর্বতে সবসময় ঝুঁকি রয়েই যায়। পর্বতে আমরা সবসময় বিপদসংকুল পরিবেশের ভিতর থাকি। এই ঝুঁকি কাউকেই ছাড় দেয়না। তাই আমাদেরকেই ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করতে হবে। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি নিয়ম-কানুন এবং নিয়ন্ত্রণ ক্ষণস্থায়ী সমাধান মাত্র এবং দীর্ঘমেয়াদে এর কার্যকারিতা থাকেনা। ঝুঁকি নিরসনে দরকার শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণ। যখনই আমি কোন পর্বতে যেতে চাই ৫০ শতাংশ সময়ই আমাকে ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসতে হয়। কখনোবা বৈরী আবহাওয়ার কারণে, কখনো প্রয়োজনীয় দক্ষতার অভাবে, আবার কখনো শারীরিক অসুস্থতার কারনে। তাই কখন এগিয়ে যেতে হবে আর কখন ফিরে আসতে হবে তা বুঝতে কিছু ধাপ সম্পর্কে ধারণা দেয়ার এখানে চেষ্টা করলাম…

বুদ্ধিবৃত্তি…

পর্বতারোহন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এখানে নিজেকে নিরাপদ ভাবার কোনোই সুযোগ নেই। পর্বত এবং প্রকৃতির নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতে নেই। আনসেলমে বাউড বলেছিলেন তিনি যখন তরুণ ছিলেন তখন পরিবেশ সম্পর্কে নয় বরং নিজেকে নিয়ে ভীত ছিলেন, কারণ তিনি নিজের সামর্থ সম্পর্কে জ্ঞাত ছিলেন না। কিন্তু বয়সের সাথে সাথে তাঁর উল্টো ঘটনা ঘটতে লাগলো। আমাদের মনে রাখতে হবে যে পর্বতে পূৰ্বানুমান খুব বেশি কাজে লাগেনা এবং নানা রকম অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটতেই পারে। পর্বত নড়ে, পাথর পড়ে, ফাঁটল বড় হয়, তুষারধ্বসও হয়। কিন্তু এর প্রত্যেকটিই ভৌগোলিক বৈচিত্রের উপর এবং আবহাওয়ার ধরণের উপর ভিত্তি করে একেক পর্বতাঞ্চলে একেক রকমের হয়। হিমবাহের গঠন, পাথরের ধরণ…সব কিছুই ভিন্ন হতে পারে। তাই আমাদের বিভিন্ন পর্বতাঞ্চলকে বোঝার চেষ্টা করতে হবে যাতে আমরা ঝুঁকি নিরুপন করতে পারি এবং ঝুঁকিমুক্ত হতে পারি।

বিনম্র অগ্রযাত্রা…

আমাদের নিজেদের ক্ষমতা সম্পর্কে জানা, অভিজ্ঞতা এবং কৌশলই সাফল্যের মূল ভিত্তি। এগিয়ে যেতে হলে নিজেদের দক্ষতা এবং কৌশলকে অবশ্যই নিরাপদ জায়গায় শানিয়ে নিতে হবে এবং পর্বতে যাওয়ার আগে নিজেদের সামর্থ্য সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হবে। নিজের সামর্থ্য এবং সর্বোচ্চ প্ৰয়োজনীয় দক্ষতার মধ্যে একটা ভালো ব্যবধান থাকা অতীব গুরুত্বপূর্ন। এই ধরণের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিজের ক্ষমতা সম্পর্কে উচ্চধারণা বাঞ্চনীয় নয়। কারণ আমাদের হাতে থাকে একটাই সুযোগ এবং ঝুঁকির মুখে থাকে আমাদের মহামূল্যবান প্রাণ। আমরা অবশ্যই অভিজ্ঞতার অভাবে ভুল করতে পারি, ব্যর্থ হতে পারি, দুর্ঘটনায় পড়তে পারি. এই প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়েই শিখতে হয়। অনেকবার আমরা পিছনে ফিরে দেখি এবং বলি “কি বোকাটাই না ছিলাম সেদিন, আরেকটু ঝুঁকি নিলেই হয়ত:….. “। এটাই আমাদের শিক্ষার প্রক্রিয়া যা আমাদের দ্রুত আয়ত্ব করতে হবে।

জ্ঞান অর্জন…

কখনো শেখা থামিওনা। সুযোগ পেলেই প্রকৃতি এবং পর্বত পর্যবেক্ষণ করো। কিভাবে ফাটলগুলো সরে যায় তা বুঝতে গ্রীষ্মে হিমবাহের দিকে দেখো। তুষারের উপর বাতাস এবং উচ্চ তাপমাত্রার প্রভাব বুঝতে প্রতিদিনের তুষারের অবস্থা দেখো। প্রতিটি স্থানে লক্ষ্য করো সূর্যের কিরণের সাথে পাথর পড়ার সম্পর্ক, বরফ নরম হবার বা জমাট বাঁধার সম্পর্ক। বিজ্ঞ ও বিশ্বস্ত পরামর্শদাতা খুঁজে নাও। জ্ঞানী ও অভিজ্ঞদের থেকে অনেক কিছুই শেখার আছে। এমন কাউকে কাছে না পেলে একজন পর্বতে পথপ্রদর্শকের সাথে যাও। এবং প্রস্তুতি নাও। ইন্টারনেটে ঘেঁটেই অনেক কিছু জানতে পারবে। কিন্তু সবচেয়ে জরুরী হলো মাঠে প্রশিক্ষণ। প্রত্যেক অভিযানের আগে কমপক্ষে এক সপ্তাহ সময় দাও তুষারধ্বসে উদ্বার কাজ, ফাটল থেকে উদ্বার, তুষারের স্তর বিন্যাস, দড়ির ব্যবহার এবং নিরাপত্তা বিষয়ক জ্ঞানার্জনে।

পরিকল্পনা করা এবং মানিয়ে নেয়া…

করণীয় কাজের একটা পরিকল্পনা তৈরী করো। কোন পথে যাবে, বিকল্প পথ এবং বেরিয়ে আসার পথ, আবহাওয়ার পূর্বাভাস এবং ধরণ, বিস্তারিত ছক এবং পথের বিবরণ তৈরী করো। কোন কাজে কি ধরণের জিনিস দরকার ভাবো। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নেয়া। ফিরে আসার সিদ্বান্ত নেয়া কখনোই ভুল নয়। যেমন আল্পসে গ্রীষ্মের তাপদাহে আশার চাইতে বেশী পাথর পড়তে পারে অথবা ফাটল বড় হয়ে যেতে পারে। নূতন তুষার পড়লে বা কয়েকদিন বৃষ্টি হলে আরোহনের পথ ভেজা বা পিচ্ছিল থাকতে পারে এবং ফাঁটল গুলো তুষারের চাদরে ঢেকে যেতে পারে। যদি আমরা শারীরিকভাবে ভালো অনুভব না করি, আমাদের বেশী সময় লাগবে, বেশী ক্লান্ত হবো এবং ভালোভাবে চলাচল করতে পারবোনা। পর্বত কোথাও চলে যাচ্ছেনা। বাড়ি ফিরে যাও, প্রশিক্ষণ নাও, কঠিন প্রস্তুতি গ্রহণ করো এবং উপযুক্ত সময় দেখে ফিরে এসো পর্বতে।     

গ্রহণ করা…

পর্বতের অবস্থা এবং আমাদের সামর্থ্য বুঝতে হবে। চিন্তা করে দেখো তুমি যে ঝুঁকি নিতে যাচ্ছ তা গ্রহণযোগ্য কিনা। এটা খুবই ব্যক্তিগত এবং স্বকীয় ব্যাপার। প্রত্যেকের আরোহন শুরুর আগে এই কাজে সময় দেয়া উচিত। অন্যরা করেছে বা করছে ভেবে কখনোই আরোহন শুরু করোনা। পরিস্থিতি যেকোন সময় পাল্টে যেতে পারে এবং দুই দিন আগের সহজ একটি আরোহন পরিণত হতে পারে বিভীষিকায়। আর হ্যাঁ, পর্বতারোহন অনেকটাই ঝুঁকি নিতে হয়, অপরিচিত পথে এগুতে হয়। এবং কিছু আরোহণে – হতে পারে একজন সেরা পর্বতারোহীর জীবনে দুই-একবার এমন কোন পথ বেছে নিতে হয় যা সাক্ষাৎ মৃত্যুকূপ। তুমি কি ওই পথ বেছে নিবে? শুধু ভেবে বের করা চেষ্টা করো তুমি কি এই ঝুঁকি গ্রহণের জন্য শারীরিক এবং মানষিকভাবে প্রস্তুত!

সমীকরণটা সরল….

সামর্থ্য/অভিজ্ঞতা + পর্বতের পরিস্থিতি + রসদ ও কৌশল: এগিয়ে যাওয়া উচিত নাকি ফিরে যাওয়া?

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *