গত ২১শে ডিসেম্বর শুরু হয়ে গেছে হিমালয়ে শীতকালীন মৌসুম, যা চলবে ৮৮ দিন ২৩ ঘন্টা ব্যাপী, রচনা করবে আরো কিছু রোমহর্ষক অভিযানের গল্প। এবার মঞ্চে আছে ক্রিস্টোফ উইলিকির নেতৃত্বে পোলিশদের কে-২ অভিযান, টোমেক ম্যাকিউইক্স ও এলিজাবেথ রেভোলের নাঙ্গা পর্বত অভিযান, আছে এলেক্স জিকন ও মোঃ আলী সাদপারার এভারেস্ট, আসছে সিমোনে মোরোর অঘোষিত অভিযান। কিন্তু সব কিছুকে ছাপিয়ে গেছে এলেক্স জিকনের ঘোষণা যে তিনি প্রথমবার বিশুদ্বভাবে শীতকালে অক্সিজেন সাহায্য ছাড়া অভিযানের ঘোষণা। যেই ইতিহাস আং রিটা শেরপা ২২ই ডিসেম্বর, ১৯৮৭ সাল অর্থাৎ ৩০ বছর আগে লিখে ফেলেছেন, সেই ইতিহাস নতুন করে লেখার কি হলো! রহস্য লুকিয়ে আছে শীতকাল এর দিনক্ষণ এর ভিতর, যেই সব মানদন্ডে শীতকাল বোঝা যায় তার ভিতর। চলুন দেখে নেয়া যাক শীতকাল বলতে আমরা কি বুঝি, এর মানদন্ড গুলোই বা কি…
প্রশাসনিক মানদণ্ড (১৫ই নভেম্বর থেকে ১৫ই ফেব্রুয়ারি):
শীতকালীন অভিযানগুলির প্রথমত: যে মানদন্ড বিচার করা হয় তা হলো, অদ্ভুতভাবে প্রশাসনিক। নেপাল, চীন, ভারত এবং পাকিস্তান সরকার – ক্যালেন্ডার অনুযায়ী শীত শুরুর অনেক আগেই আসন্ন শীতকালীন অভিযানের জন্য পারমিট প্রদানে অভ্যস্ত। এমনকি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতিক্রমে কিছু শীতকালীন অভিযান শুরু হয় নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে। প্রশাসনিক মানদণ্ডের ভিত্তিতে আট হাজারের শীতকালীন শীর্ষ আরোহনের তালিকায় আশির দশকের শীতকালে সবচেয়ে সক্রিয় পোলিশদের সাথে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বেশ কয়েকটি জাপানী অভিযান। জ্যোতির্বিজ্ঞান অনুযায়ী শীতকাল শুরুর আগে কিন্তু প্রশাসনিক মানদন্ডে শীতকালে সামিট হওয়ায় দুইটি প্রথম শীতকালীন সামিটের দাবী রয়ে যায় বিতর্কিত। এই বিতর্কিত সামিটগুলো হলো জিয়ান-ক্রিস্টোফ লেফাইলির ২০০৪ সালের ১১ই ডিসেম্বর আরোহন করা শীশাপাংমা এবং আকিউ কোইজুমি এবং নিমা ওয়াংচুর শেরপার ১৯৮২ সালের ১৩ই ডিসেম্বর আরোহন করা ধৌলাগিরি। প্রশাসনিক মানদণ্ডের উল্টোপিঠও রয়েছে। নেপালের সরকার প্রাথমিকভাবে প্রথম শীতকালীন এভারেস্ট সামিটের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি, কারণ তা হয়েছিল ১৭ই ফেব্রুয়ারি, যা ছিল প্রশাসনিক নির্ণায়ক অনুযায়ী শীতকাল শেষ অর্থাৎ ১৫ই ফেব্রুয়ারির দুই দিন পর।

চিত্রঃ প্রথম শীতে এভারেস্টের সামিটে ক্রিস্টোফ উইলিকি
আবহাওয়ার মানদন্ড (১লা ডিসেম্বর হতে ২৮ই ফেব্রুয়ারি):
অনেকের মতে আবহাওয়া হলো সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত মানদণ্ড। যেহেতু এটি নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট স্থানে তাপমাত্রা, বায়ু, আর্দ্রতা, বরফের অবস্থা, আলোর সময়কাল বিবেচণায় নিয়ে ‘শীতকাল’ পরিমাপের একটি স্কেল হিসেবে কাজ করে। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ মিটিও রোলজির পর্বতারোহী এবং আবহাওয়াবিদ হুয়ান গুয়েরা ব্যাখ্যা করেন: ” শীতকালের প্রবেশ এবং বৈশিষ্ট্য কিছুটা উপলব্দির উপর নির্ভরশীল। এটি প্রতিটি দেশ এবং এমনকি একটি দেশের প্রতিটি অঞ্চল অনুযায়ী অক্ষাংশ এবং উচ্চতার কারণে পরিবর্তিত হয়।” যেমন ধরুন, স্পেনের শীতকালে থাকবে ইউরোপের উত্তরের একটি দেশে বসন্ত। হিমালয় অঞ্চল ইকুয়েডর অক্ষাংশের কাছাকাছি থাকার কারণে, শীতকালীন আবহাওয়া ২১শে ডিসেম্বরের আগেই শুষ্কতার সাথে শুরু হয়ে মার্চের শেষ পর্যন্ত প্রলম্বিত হতে পারে।
এই মানদন্ড অনুসারে হিমালয়ে শীতকাল শুরু হয় ডিসেম্বরের শুরু থেকে যা অনেকটাই প্রশাসনিক মানদণ্ডের সাথে মিলে যায়। অন্যান্য পর্বতারোহীদের মাঝে এই মানদণ্ডের সবচেয়ে বড় সমর্থক হলেন শীতের অন্যতম যোদ্ধা ডেনিস উরুবকো। তিনি মনে করেন ২৮ই ফেব্রুয়ারির পর থেকে দিনে আলোর উপস্থিতির উপর ভিত্তি করে আবহাওয়া অনেকটা বসন্তকালীন রূপ ধারণ করে। তাই এই মাপকাঠি অনুযায়ী শীতকালের শুরু এবং শেষ ধরা উচিত যথাক্রমে ১লা ডিসেম্বর এবং ২৮ই ফেব্রুয়ারিকে। এই সময়ের মধ্যে যখনি সামিট হোক না কেনো সেটি বিবেচিত হবে শীতকালীন সামিট হিসেবে। তাঁর মানদন্ডে আবার ব্রডপিক এবং গাসারব্রাম-১ এ শীতকালীন সামিট প্রশ্নবিদ্ব হয়ে যায়, কারণ এই দুটিই হয়েছিল মার্চে। আবার সিমোনে মোরো এবং পিটার মোরস্কির প্রথম শীতকালে শিশা পাংমা সামিটের কীর্তি চলে যায় জিয়ান-ক্রিস্টোফ লেফাইলির কাছে।
জ্যোতির্বিদ্যাগত মানদণ্ড (২১শে ডিসেম্বর থেকে ২১শে মার্চ):
উত্তর গোলার্ধের দিনপঞ্জী স্পষ্টতই শরত্কাল এবং শীতকালে সীমানা চিহ্নিত করে। এই সীমানাটি সাধারণত ডিসেম্বরের ২০ থেকে ২৩শে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি (সাধারণত ২১শে ডিসেম্বর)। একইভাবে শীত এবং বসন্তের সীমানা অঙ্কিত আছে ২১শে মার্চে। জ্যোতির্বিদ্যা সংক্রান্ত দৃষ্টিকোণ থেকে একটি অভিযানকে শীতকালীন অভিযান বিবেচনা করার জন্য একটি অভিযান ২১শে ডিসেম্বর থেকে ২১শে মার্চের মধ্যেই সম্পন্ন হওয়া আবশ্যক। এই মাপকাঠি শীতকালীন হিমালয় অভিযানের কিংবদন্তি ক্রিস্তোফ উইলিকির দ্বারা স্বীকৃত এবং সাধারণভাবে বর্তমানে শীতকালীন অভিযান বিচারে এই মানদণ্ডেই ব্যবহৃত হয়। এই মাপকাঠিতে শুরু যখনই হোক না কেনো, যে অভিযান ওই সময়ের মধ্যে শেষ হবে তাই শীতকালীন অভিযান।
বিশুদ্বতাবাদী মানদন্ড:
জ্যোতির্বিদ্যাগত মানদণ্ড এর উপর ভিত্তি করে শীতকালীন আরোহনের সম্রাট সিমোনে মোরো আরো বিশুদ্ব ও কঠোর মাপকাঠির কথা বলেন। জ্যোতির্বিদ্যার মতোই এই ক্যালেন্ডার শুরু হয় ২১শে ডিসেম্বর এবং শেষ হয় ২১শে মার্চ। তাঁর মূল বক্তব্য হচ্ছে শীতকালীন অভিযান শীত শুরুর আগে শুরু হতে পারবেনা। তাঁরমতে একটি অভিযান যদি শীত শুরুর আগে বেসক্যাম্পও স্থাপন করে তাহলে তা শীতকালীন অভিযান হিসেবে বিবেচিত হতে পারেনা। তিনি বলেন, “ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে, নিশ্চিত ভাবেই বলা যায় যে কয়েকটি আটহাজারী পর্বতে প্রথম শীতকালীন আরোহন গ্রহণযোগ্য নয়। তাই এটি নাঙ্গা পর্বত ও কে-২ এর সাথে শেষ হবে না। নি:সন্দেহে এই দুটি পর্বতের রয়েছে ভিন্ন আবেদন। কিন্তু যারা সবগুলো আটহাজারী পর্বতে প্রথম শীতকালীন আরোহন চান তাঁদের জন্য খেলার মাঠ এখনো উন্মুক্ত।”
এই মানদণ্ডটি প্রয়োগ করে, এভারেস্ট সহ পাঁচটি আটহাজারী পর্বত রয়ে যায়, যা পরিপূর্ন শীতকালীন অভিযান হিসেবে বলা যায়না। শীতকালীন পর্বতারোহণের ইতিহাস আবারো লিখতে না চাইলেও সম্পূর্ণ বিশুদ্ধ শৈলীতে শীতকালীন অভিযানের ইতিহাস লেখার জায়গা কিন্তু এখনো খালিই রয়ে গেছে।
এভারেস্ট প্রথম শীতকালে সামিট হয় ১৭.০২.১৯৮০। ক্রিস্টোফ উইলিকি ও লেজেক চিছে এই দিনে এই কীর্তি গড়েন, যা প্রশাসনিক মানদন্ডে প্রাথমিক স্বীকৃতি পায়নি। আবার এলিজাবেথ হাউলির প্রশাসনিক মাপকাঠিতে নথিভুক্ত করা হিমালয়ান ডাটাবেজ অনুসারে ১৫টি শীতকালীন সামিট এর ৮টিই হয়েছিল জ্যোতির্বিদ্যাগত শীতকাল শুরুর আগে। বাকি ৭টির মধ্যে ৪টি আবার হয়েছিল জ্যোতির্বিদ্যাগত শীত শুরুর দুই একদিনের মধ্যে, যা আবার বিশুদ্বতার মানদন্ডে টিকে না। এলেক্স জিকন এবার প্রথম বিশুদ্ব রূপে শীতকালে অক্সিজেন সাহায্য ছাড়া এভারেস্ট সামিটের লক্ষ্যে অভিযান করছেন। এযাবৎ অক্সিজেন সাহায্য ছাড়া শীতে পৃথিবীর শীর্ষে পৌঁছানো একমাত্র ব্যক্তি হলেন আং রিটা শেরপা, যিনি সামিট করেন ২২ই ডিসেম্বর। যেহেতু তিনি শুরুতেই অভিযান শুরু করেন, তাই এলেক্স এর এইবারের অভিযানের মূল ব্যাপার হচ্ছে বিশুদ্বতা।
চলুন কথার ফাঁকে দেখে নেয়া যাক হিমালয়ান ডাটাবেজ অনুসারে শীতকালে এভারেস্ট আরোহনের চিত্র:

চিত্রঃ শীতে এভারেস্ট অভিযান ও বিভিন্ন মানদন্ডে তাদের যোগ্যতা
এই যদি হয় এভারেস্টের অবস্থা চলুন দেখে নেয়া যাক বাকি পর্বতগুলোর কী দশা:
-
- ১৯৮৬ সালের ১১ই জানুয়ারি জর্জ কুকুস্কা এবং ক্রিস্টোফ উইলিকি প্রথম শীতকালে কাঞ্চনজঙ্গার শীর্ষে পৌঁছালেও তাঁরা বেসক্যাম্প স্থাপন করেন ১০ই ডিসেম্বর। তাই শীতকালীন আরোহন হলেও বিশুদ্ব শীতকালীন অভিযান বলা যায়না একে। কাঞ্চনজঙ্গাতে দ্বিতীয়বার আরোহন করেন কোরিয়ান জিয়ং-শেল লি, ১৯৮৮ সালের ২য় জানুয়ারি। এই আরোহনও বিশুদ্বতার মানদন্ডে একই কারণে টিকে না।
-
- ১৯৮৮ সালের ৩১সে ডিসেম্বর ক্রিস্টোফ উইলিকি একাকী প্রথম লোৎসে সামিটে পৌঁছালেও নভেম্বরে বেসক্যাম্প স্থাপন করে বিশুদ্বতার মানদন্ডে এটিও শুদ্ব নয়।
-
- ধৌলাগিরি পর্বত প্রথম শীতকালীন সামিট করেন ১৯৮৫ সালের ২১শে জানুয়ারি জর্জ কুকুস্কা ও আন্দ্রেই সোখ। কিন্তু নভেম্বরে বেসক্যাম্প স্থাপন করায় এটি বিশুদ্ব নয়। আবার এর ৩ বছর পূর্বেই জাপানের আকিও কোইজুমি এবং নেপালের নিমা ওয়াংচু শেরপা ১৯৮২ সালের ডিসেম্বরের ১৩ তারিখ সামিট করেন। কিন্তু জ্যোতির্বিদ্যাগত গ্যাড়াকলে পরে এই সামিট শীতকালীন আরোহনের স্বীকৃতি পায়নি।
- ১৯৮৪ সালের ১২ই জানুয়ারি মাসিয়েজ বেরবেকা ও রাইজার্ড গাজেউস্কি মানাসলু প্রথম শীতকালীন সামিট করেন। কিন্তু ২রা ডিসেম্বর বেসক্যাম্প স্থাপন করায় এই অভিযান বিশুদ্বতার মানদন্ডে উৎরে যায় না। প্রশাসনিক শীতকালে আরো ৩ অভিযানে ১২ জন সামিট করলেও তা জ্যোতির্বিদ্যাগত শীতের আগে হওয়ায় কোনোটিই শীতকালীন অভিযানে স্বীকৃতি পায়নি। আর তাই বিশুদ্ব সামিটের জন্য ২০১৫ সালে তামারা লুঙ্গারকে নিয়ে এক ব্যর্থ অভিযান করেন সিমোনে মোরো।
এবার চলুন দেখা যাক আটহাজারী পর্বতমালায় প্রথম স্বীকৃত শীতকালীন সামিটগুলোর বিভিন্ন মানদন্ড অনুযায়ী অবস্থা..

চিত্রঃ ৮হাজারী পর্বতে প্রথম শীতকালীন সামিট এবং বিভিন্ন মানদন্ডে এদের স্বীকৃতি
জ্যোতির্বিদ্যা অনুসারে সর্বাধিক স্বীকৃত শীতকালীন পর্বতারোহণের সাফল্যের তালিকা কোনোভাবেই অগ্রাহ্য করা যায়না। কিন্তু পর্বতারোহীরা প্রতিনিয়ত নতুন নতুন চ্যালেঞ্জের অপেক্ষায় থাকে আর সন্দ্বান পেলেই ঝাঁপিয়ে পড়ে। কে-২ এর প্রথম আরোহনের অভিযান যেমন চলছে, তেমনি কোন পর্বতারোহী হয়ত: ঝাঁপিয়ে পড়বে মোরো বা উরুবকোর দেয়া বাদবাকি তালিকা পূরণে, রচিত হবে নতুন ইতিহাস।
**********************************************************************

Recent Comments