বর্ষার বিদায়ধ্বনি বেজে উঠতেই হিমালয়ে বাড়তে থাকে উচ্চাভিলাষী পর্বতারোহীদের ভীড়। উচ্চাভিলাষী বললাম কারন প্রলম্বিত বর্ষা এবং বর্ষার রেখে যাওয়া পর্বতে তুষারের স্তূপ কঠিন পর্বতারোহণকে করে তোলে কঠিনতর। এরই মাঝে নেপালের মিনিস্ট্রি অফ ট্যুরিজম এই শরতের জন্য ১৯ টি নেপালের পর্বতের জন্য ইস্যু করেছিল ২৭৭ টি অনুমতি। অনুমতির সিংহভাগই ছিল চৌ-ইয়্যু এবং মানাসলুর মতো পর্বতে, সামিটের সফলতাও এসেছে শুধুমাত্র এই দুইটি পর্বতেই। এভারেস্ট, শীশাপাংমা, ধৌলাগিরী যেখানে ফিরিয়ে দিয়েছে সবাইকে সেখানে কাঞ্চনজঙ্গা, লোৎসে, মাকালু, অন্নপূর্ণাতে কেউ অনুমতিই নেয়নি। পুরো মৌসুম জুড়েই ছিল ব্যর্থতা, ছিল মৃত্যু, ছিল বারংবার চেষ্টা, ছিল বিতর্ক। এসব ঘটনার ঘনঘটার ভিতরে অতিক্রান্ত হয়ে গেলো এবারের শরৎ। চলুন কেমন গেলো এই মৌসুম…
এভারেস্টে দুই দুঃসাহসী…
এবার দক্ষিণে কোন অভিযাত্রী না থাকায় পর্বতের উত্তরদিকেই ছিল সবার দৃষ্টি। কারন ওইদিকে ভিন্নরুপ লক্ষ্য নিয়ে হাজির হয়েছিলেন কিলিয়ান জর্নেট এবং নবুকাজু কুরিকি। অতিরিক্ত তুষারস্তর আগেই পর্বতের অবস্থা খারাপ করে রাখলেও স্পেনীশ মাউন্টেইন রানার জর্নেটের লক্ষ্য ছিল অতিরিক্ত অক্সিজেনের সাহায্য ছাড়াই স্পিড রেকর্ডের। অন্যদিকে জাপানী ক্লাইম্বার কুরিকির লক্ষ্য ছিল অতিরিক্ত অক্সিজেনের সাহায্য ছাড়াই সলো ক্লাইম্ব করার।
মাসখানেক ধরে অভিযোজিত হবার পর এভারেস্টের উত্তরদিকের বেসক্যাম্পে পৌঁছেন জর্নেট। লক্ষ্য ছিল ২০ ঘন্টায় সামিটে পৌঁছা এবং ৩৫ ঘন্টায় নেমে আসা। কিন্তু সামগ্রিক অবস্থা বিবেচনা করে তিনি সিদ্বান্ত গ্রহণ করেন যে এভারেস্ট এই মৌসুমে আরোহন করা সম্ভব নয়। তিনি আগামী বছর আবার এভারেস্টে আসার আশাবাদ ব্যক্ত করে অভিযান সমাপ্তি ঘোষণা করেন।
কিন্তু কুরিকি চিরদিনই মাটি আঁকড়ে পরে থাকার মানুষ। তিনি অপেক্ষার সিদ্বান্ত নেন। কিন্তু ক্রমাগত খারাপ আবহাওয়া এবং হিমবাহ ধ্বস ক্লাইম্বিং তো দূরের কথা অভিযোজন প্রক্রিয়াতেও বাধা সৃষ্টি করে। অক্টোবরের শুরুতেই কুরিকি সামিট পুশ শুরু করে অতিরিক্ত খারাপ আবহাওয়ার কারনে ৭ই অক্টোবর ৭৪০০ মিটার উচ্চতা হতে ফিরে আসতে মনস্থির করেন। এরই সাথে এভারেস্ট ফিরিয়ে দিলো ৯ আঙ্গূল হারানো এই পর্বতারোহীকে। পোলিশ লিজেন্ড এডাম বিয়েলকি এবং ফ্রেঞ্চ এলিজাবেথ রেভল এভারেস্টে এক নতুন রুট আরোহনের ঘোষণা দিলেও প্রস্তুতিকালীন সময়ে বিয়েলকি আঘাত পাওয়ায় অভিযান শুরুর আগেই বাতিল হয়ে যায়।

বেনগাস ব্রাদার্সের তোলা মানাসলু বেসক্যাম্প ট্রেকের ছবি।।
লোৎসে সাউথ ফেস…
সুং-টায়েক হং গত কয়েক বছর ধরে এই ক্লাইম্বকে রুটিনে রুপান্তরিত করে ফেলেছেন। তিনি এরই মধ্যে প্রচন্ড হিমবাহ ধ্বসের ঝুকিপূর্ণ এই ফেস ৪ বার চেষ্টা করে ফেলেছেন, যার মধ্যে ৩ বারই ছিল বিগত ৩ বছরে। কিন্তু কিছু সূত্রমতে এই বছরও এই ফেস তাঁকে এবং তাঁর নেতৃত্বাধীন কোরিয়ান দলকে ৫ম বারের মতো ফিরিয়ে দিলো। আবার আরেক সূত্র মতে এবার নেপাল থেকে তাঁর নামে কোন পারমিটই ইস্যু হয়নি। সে যাই হোক, সারমর্ম হলো পৃথিবীর ৪র্থ শীর্ষ এই পর্বত এই মৌসুমে রয়ে গেলে কোন দলের আওতার বাইরে।
চৌ-ইয়্যুতে সামিট উৎসব…
এভারেস্টের পর সবচেয়ে বেশী সামিট হওয়া এই পর্বতে এবারো হয়েছিল এডভেঞ্চার কনসাল্টেন্টস, আল্পাইন এসেন্টস, এশিয়ান ট্রেকিং, ইন্টারন্যাশনাল মাউন্টেইন গাইডস, আল্পেন গ্লো, ৭ সামিট ক্লাইম্ব এবং সামিট ক্লাইম্ব নামক কমার্শিয়াল এক্সপিডিশন গুলোর সমাগম। সফল এই মৌসুম শেষ হয় চৌ-ইয়্যূতে প্রায় শ’খানেক সামিটের মাধ্যমে।
ধৌলাগিরীতে অল্টিচ্যূড জাঙ্কিস…
এই পর্বতে এবার একমাত্র টিম নিয়ে গিয়েছিল অল্টিচ্যূড জাঙ্কিস। তাঁরা সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে সামিট পুশের জন্য সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছিলেন। ২৮ই সেপ্টেম্বর ফিল ক্রেম্পটনের দল সামিট পুশ শুরু করলেও সামিট উইন্ডোর আগে আসা ঝড় পর্বতে রেখে গিয়েছিল প্রচূর নরম তুষার। ক্যাম্প-২ এর আশেপাশেই জমেছিল ৩ ফুট তুষারের আস্তরণ। তাই দলের সবাই ফিরে আসতে মনস্থির করেন। এরই সাথে এই মৌসুমে ধৌলাগিরী থেকে গেলো আন-ক্লাইম্বড।
মানাসলুতে সামিট রেকর্ড…
খুবই সফল একটা মৌসুম অতিক্রান্ত হলো এবার মানাসলুতে। বেসক্যাম্প মুখরিত করে রেখেছিল সেভেন সামিট ট্রেকস, হাই-ম্যাক্স এর মতো পুরোনো অপারেটরের পাশাপাশি বেনেগাস ব্রাদার্স নামক নতুন অপারেটরও। ২৯ ও ৩০ই সেপ্টেম্বর কমার্শিয়াল এক্সপিডিশনগুলোর ১৫০ জনেরও বেশী ক্লাইম্বার মানাসলু সামিট করেন। কিন্তু প্রকৃত সামিট সংখ্যা জানতে আরো অপেক্ষা করতে হবে। কারন হলো মিংমা শেরপার ফেসবুক প্রোফাইলে পোস্ট করে নিচের এই ছবি যা মিংমা তুলেছিলেন মূল সামিট থেকে। এতে দেখা যাচ্ছে ফলস সামিটের উপর ক্লাইম্বারদের ভীড়।

কিন্তু এই কমার্শিয়াল এক্সপিডিশনের পাশাপাশি মানাসলুতে চলছিল আরেক ভিন্নরুপ অভিযান। আলবার্তো যেরাইন এবং মারিয়ানো গালভান টার্গেট করেছিলেন উত্তর দিকের এক নতুন লাইন। তাঁরা আগেই ৬৪০০ মিটারে ক্যাম্প-২ স্থাপন করে সকল রসদ জমা করে রেখেছিলেন সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে সামিট পুশের জন্য। কিন্তু সামিট পুশ শুরু করার পর তাঁরা ওই ক্যাম্পের কোন চিহ্নই খুঁজে পাননি। ক্যাম্প হয়তঃ দেবে গিয়েছিল তুষারের নিচে অথবা ভেসে গিয়েছিল হিমবাহ ধ্বসে। এই অবস্থায় আর সামনে এগুনো বিপদজনক ভেবে যেরাইন ২৮ই সেপ্টেম্বর বেসক্যাম্পে ফিরে এলেও গালভান একাই এগিয়ে চললেন। চারদিন পর তিনি সামিটের মাত্র ৩০০ মিটার নিচ হতে এক অত্যন্ত টেকনিক্যাল সেকশন পাড়ি দিতে ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসেন। পরে এই দুই ক্লাইম্বার নরমাল রুট দিয়ে ৪ই অক্টোবর মানাসলু সামিট করেন।
শীশাপাংমায় হিমবাহ ধ্বস…
১৪তম শীর্ষ এই পর্বতে এবার দল নিয়ে এসেছিল আর.এম.আই.। ভালো আবহাওয়া পেয়ে তাঁরা ২৭ই সেপ্টেম্বর সামিট পুশ শুরু করেন। শেরপাদের অগ্রবর্তী দল ক্লাইম্বারদের একদিন আগেই যাত্রা শুরু করেছিল। ৩০ই সেপ্টেম্বর শেরপা’র দল ক্যাম্প-৩ এর কাছাকাছি পৌঁছালে এক হিমবাহ ধ্বসের মুখোমুখি হয়, যাতে প্রাণ হারান একজন শেরপা। এই দূর্ঘটনার পরদিনই অভিযানের সকল সদস্য বেসক্যাম্পে নেমে আসেন এবং অভিযানের সমাপ্তি ঘোষনা করেন।
দীর্ঘায়িত হলো অস্কার কাডিয়াক এর অপেক্ষা…
এবার গ্রীষ্ম জুড়েই ব্রডপিকে অনেকের নজর আটকে ছিল অস্কার কাডিয়াকের কারনে। একাধিকবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ কাডিয়াক ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি ব্রডপিকে ফিরছেন এই শরতেই। কিন্তু পাক-ভারত উত্তেজনায় তিনি সেই আরাধ্য অনুমতি পেলেন না, যার ফলে প্রলম্বিত হলো কাডিয়াকের ১৪টি হিমালয়ান ক্রাউন জয়ের ক্ষণ গণনা।
অতঃপর মৃত্যু…
-
- ২৭ই সেপ্টেম্বর ৭১২৬ মিটার উচ্চতার হিমলুং হিমালে এক্টিভ হলিডে ট্রেকস এর এক শেরপা হিমবাহ ধ্বসে হারিয়ে যান।
-
- ৩০ই সেপ্টেম্বর শীশাপাংমাতে ক্যাম্প-৩ এর কাছাকাছি হিমবাহ ধ্বসে হারিয়ে যান এক শেরপা।
-
- ৭ই অক্টোবর জাপানী আল্পাইনিস্ট হিরোতাকা ওন্ডেরা মানাসলু’র সামিটে সঙ্গীর ছবি তোলার সময় পা পিছলে হারিয়ে যান।
-
- ৮ই অক্টোবর ৬১১৯ মিটার উচ্চতার লবুচে ইস্ট পিকে সামিট শেষে দড়ি সংগ্রহ করার সময় মারা যান আং ছোংবা শেরপা নামক ২৪ বছর বয়সী এক শেরপা।
- এছাড়াও চেরিং শেরপা, দর্জি লামা, রঞ্জন বাসনেৎ এবং এক বিদেশী মানাসলু সার্কিটে ভূমি ধ্বসে মৃত্যুবরণ করেন।
………………………………………………………………………………………………………………….
তথ্যসূত্রঃ
হিমালয়ান টাইমস, বিভিন্ন ব্লগ এবং বিভিন্ন অভিযাত্রীদের ফেসবুক ও টুইটার পেইজ হতে সংগৃহীত ও সংকলিত।

Recent Comments