কুম্ভকর্ণের ছায়ার দেয়াল

কাঞ্চনজঙ্গার পশ্চিম দিকেই রয়েছে ৭৭১০ মিটার উচ্চতার বিশ্বের ৩২তম শীর্ষ পর্বত – জান্নু (Jannu) । অফিশিয়ালি এর নাম কুম্ভকর্ণ। স্থানীয় লিম্বু ভাষায় এর আরো একটি নাম রয়েছে ফোকটাং-লুংমা, যার অর্থ হলো কাঁধসহ পর্বত। এও পর্বত প্রথম আরোহণ করা হয় ১৯৬২ সালে। কিন্তু কুম্ভকর্ণের যেই নর্থ ফেসকে ধরা হয়ে থাকে পৃথিবীর অন্যতম বিপদজনক ফেস হিসেবে –সেই “ছায়ার দেয়াল” খ্যাত ফেস প্রথম সরাসরি আরোহণ করা সম্ভবপর হয়ে উঠে ২০০৪ সালে।  

বিংশ শতাব্দীর শেষ নাগাদ রাশিয়ানরা বিখ্যাত পর্বতগুলোর বিখ্যাত দেয়ালগুলোতে নতুন পথে আরোহণের একটা প্রজেক্ট হাতে নিয়েছিল, যার নাম দিয়েছিল “বিগ ওয়াল – রাশিয়ান ওয়ে”। ২০০৩ সালের শরৎে এই প্রজেক্টের স্বপ্নদ্রষ্টা আলেক্সান্ডার ওডিনস্টোভের নেতৃত্বে রাশিয়ান দল ৭৭১০ মিটার উচ্চতার জানু পর্বতের উত্তর দিকের দেয়াল বেয়ে ৭২০০ মিটার পর্যন্ত পৌঁছাতে সক্ষম হয়, যা ছিল ওই সময় পর্যন্ত ওই দেয়ালে রেকর্ড উচ্চতায় আরোহণ। বিশ্বসেরা অনেক পর্বতারোহী চেষ্টা চালালেও বিংশ শতাব্দী জুড়েই এই দেয়াল থেকে যায় অজেয়।

ওডিনস্টোভ হার মানার পাত্র ছিলেন না। তিনি ২০০৪ সালের বসন্তে আবার বেরিয়ে পড়েন এই দেয়ালের পথে। এবার দলে ছিলেন আলেক্সান্ডার রুছকিন, নিকোলাই টটমায়ানিন, সার্জেই বরিসভ, গেন্নাডি কিরিভিস্কি, এলেক্সি বলটোভ, মিখাইল পারশিন, দিমিত্রি পাভলেঙ্কো, মিখাইল মিখিলভ, ইভান সামোয়লেঙ্কো এবং মিখাইল বাখিন। এই দলে ছিলেন দুইজন পাইওলেট ডি’অর জয়ী, পাঁচজন এভারেস্টার যাদের মধ্যে দুইজন আবার অক্সিজেন সাপোর্ট ছাড়াই সামিট করেছিলেন। এই দল ২৬শে মে নর্থ ফেসের ডিরেক্ট লাইন আরোহণ করে এই পর্বত প্রথমবারের মতো সামিট করেন, যার জন্য তাঁরা পাইওলেট ডি’অর জিতে নেন পরেরবার। সেই দুঃসাহসী অভিযানের অভিযাত্রীদের রিপোর্ট হতে সংগৃহীত ও সংক্ষেপিত চুম্বক অংশ উপস্থাপনের এক প্রয়াস নিম্নে নেয়া হলো…

jannu

ছবিঃ জান্নু নর্থ ফেস। ১ নং লাইন হলো ১৯৭৬ সালে আরোহণ করা জাপানী দলের রুট। ২ নং লাইন হলো ২০০৪ সালের রাশিয়ান দলের রুট।

আমরা এপ্রিলের ৫ তারিখ বেসক্যাম্পে পৌঁছে গেলাম। শরতের চেয়ে এখন দেয়ালটা অনেক পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। এপ্রিলের ৭ তারিখ হতেই আমাদের প্রথম দল দেয়ালে কাজ শুরু করে দিলো – যাতে ছিল বলটোভ, বরিসভ এবং কিরিভিস্কি। মাত্র দুইদিনেই তাঁরা ৫৬০০ মিটারে প্রথম ক্যাম্প স্থাপন করে ফেললো। আবহাওয়া শরতের মতোই বিভ্রান্তিকর। এপ্রিলের ২১ তারিখ ওই ৩ জন ৭০০০ মিটার উচ্চতায় দেয়ালের পাদদেশে পৌঁছে গেলো। তারপরই হঠাৎ চোখের নিমিষেই আবহাওয়া পাল্টে যেতে লাগলো। প্রচন্ড ঘুর্ণিঝড় নিয়ে এলো তীব্র তুষারপাত। প্রচন্ড বাতাস এবং তুষারধ্বসের কারনে নেমে আসাও অসম্ভব। ওই অবস্থায় ৩ জন আটকে রইলো। অবশেষে দুইদিন পর আবহাওয়া একটু সদয় হলে তাঁরা নিচের ক্যাম্পে নেমে আসলো। যখন বেসক্যাম্পে ক্লাইম্বাররা ফিরলো তখন তাঁরা ক্লান্তির চরম সীমায় পৌঁছে গেছে এবং তাঁদের দ্বারা আর এগুনো সম্ভব ছিলনা। এমতাবস্থায় নতুন তিনজন দায়িত্ব নিলো। এরা হলো মিখিলভ, রুছকিন এবং পাভলেঙ্কো। কিছুদূর এগুনোর পর এই অভিজ্ঞ দলের প্রত্যেকেই একমত হলেন যে পথের কাঠিন্য তাঁদের কল্পনাকেও হার মানিয়ে যাচ্ছে। ঠান্ডাও ছিল হার কাঁপানো। এতো অভিজ্ঞ আল্পাইনিস্টদেরও দিনে বিশ হতে চল্লিশ মিটার এগিয়ে যাওয়া দুষ্কর হয়ে উঠলো। ৪-৫ দিন পরপর পালাবদল করে আমরা এগিয়ে চললাম। মনে শংকা বেড়েই চলেছেঃ আসলেই কী এটা আরোহণ সম্ভব?

অগ্রযাত্রা খুবই শ্লথ হয়ে গেছে। মে মাসের ১৪ তারিখ ৭৫০০ মিটারে পৌঁছালাম এবং ৭৪০০ মিটারে একটি পোর্টালেজ লাগানো হলো। অগ্রবর্তী দলের প্রতিটি সদস্যই প্রতি মূহুর্তে যুদ্ধ করে চলেছে এক-একটি মিটার উচ্চতা অতিক্রম করতে। আর কোন দেয়াল মনে হয় এতোটা চেষ্টা দাবী করেনা। একমাত্র সান্ত্বনা হলো ৭০০০ মিটারে দাঁড়িয়ে ৭৭১০ মিটার উচ্চতায় সামিট পয়েন্ট পর্যন্ত পুরো ফেইসটাই সম্পূর্ণ দৃষ্টি গোচর হয়। প্রতিটি দিনই যেনো মনে সন্দেহ ঘনীভূত হচ্ছে যে এইবার আমরা ব্যর্থ হবো। এই ধরনের টেরাইন সম্পর্কে আমরা কোথাও শুনিনি বা দেখিনি। নিজেদের শক্তিক্ষয় স্পষটতই অনুভব করতে পারছি, ঠিক যেনো এটা একটা যুদ্ধক্ষেত্র। আর যোদ্বারা সবাই যেনো বন্দুকের ছোঁড়া গুলির মতো বিক্ষিপ্ত – কারো যেনো মাথা থেঁতলান, কারো যেনো পাঁজর ভাঙ্গা, সামনের ভয়াবহতার দিকে চোখ যেনো মেলে চাইতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। প্রতি পদই বিপদসংকুল, প্রতি পদেই মৃত্যুফাঁদ।

২২ই মে মিখিলভের পলমোনারি এডিমা’র লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে উঠলো এবং সাথে সাথে তাঁকে বেসক্যাম্পে নামানো হলো। রুছকিন এবং পাভলেঙ্কো ৭৬০০ মিটারে পৌঁছাল। সেখানে সব ঝুরঝুরে পাথরে ভর্তি। নিরাপত্তা যেনো সুদূর কল্পনা। ২৬শে মে রুছকিন ও পাভলেঙ্কো সামিটের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পরলো। খুব কঠিন দু’টি পিচ আরোহণ করতে পারলেই স্নো রিজ দিয়ে সামিট পর্যন্ত সহজ পথ। আমরা টেলিস্কোপ দিয়ে তাঁদের দেখছিলাম। হঠাৎ দুপুর ১টার দিকে দেখতে পেলাম মেঘ পর্বতটিকে ঢেকে ফেলেছে। মেঘের সাথেই আমাদের মনকে ঘিরে ফেলেছে উৎকন্ঠা। রেডিওতেও তাঁদের কোন সাড়া শব্দ পাচ্ছিনা। শেষ পর্যন্ত বিকাল ৫টায় সেদিন সকালে পোর্টালেজ এর দিকে এগিয়ে যাওয়া বরিসভ ও কিরিভিস্কি রেডিওতে জানালো দুপুর ৩.৩০ মিনিটে রুছকিন ও পাভলেঙ্কো সামিটে পৌঁছেছেন। এরই সাথে পূর্ণ হলো নর্থফেসের মধ্য বরাবর প্রথম আরোহণ। ২৮শে মে, বরিসভ, কিরিভিস্কি এবং টটমায়ানিন ও সামিট করলো। ওইদিনই সবাই ৭০০০ মিটারে স্থাপিত ক্যাম্পে নেমে এলো, আর আমাদের অভিযান পূর্ণ করলো অভীষ্ট লক্ষ্য।

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *