আটহাজারী পর্বতের রয়েছে এক অমোঘ আকর্ষণ। তাই ক্লাইম্বিং মৌসুমগুলোতে এইসব পর্বতের বেসক্যাম্পে লেগে থাকে ভীড়| ইথারে ভেসে আসা দুই-একটি ওয়েদার উইন্ডোতে সব বাণিজ্যিক অভিযাত্রী দল যখন ঝাঁপিয়ে পরে নিয়মিত রুটগুলোতে, তখন ভিন্ন স্বপ্নে বিভোর থাকেন আল্পাইনিস্টরা| তাঁরা স্বপ্ন দেখেন সম্ভবপর নতুন রুট বের করার, না হয় দুই-একবার আরোহন হওয়া কোন দুর্গম রুটে আবার আরোহনের। বিপদ আছে জেনেও ঝাঁপিয়ে পরেন সেই দেয়ালে। এমনই এক ভয়ংকর আকর্ষণীয় এক রুটের নাম মাজেনো রিজ| নাঙ্গা পর্বতের দক্ষিণ-পশ্চিম কোনায় অবস্থিত এই রিজ এর পরিচয় আটহাজারী পর্বতমালার মধ্যে দীর্ঘতম রুট হিসেবে| ১৩ থেকে ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রুট নাঙ্গা পর্বতের ডায়ামির এবং রুপাল ফেসকে বিভক্ত করেছে| আরও আকর্ষণীয় ব্যাপার হচ্ছে এই রুট অতিক্রম করতে পাড়ি দিতে হয় ৮টি ৬৫০০ মিটারের অধিক উচ্চতার শৃঙ্গ| ২০১২ সালে রিক এলেন এবং স্যান্ডি এলেন মাজেনো রিজ দিয়ে নাঙ্গা পর্বত সামিটের সাফল্যের জন্য পর্বতারোহণের অস্কার খ্যাত “পাইওলেট-ডি’অর” জয় এই রিজের কাঠিন্য এবং ব্যাপকতার ব্যাপারে পর্বতারোহণের জগতের দৃষ্টি ভঙ্গি জানান দেয়|
অনেকদিন আড়ালে থাকা এই রুট এবারের মৌসুমে আবারো আলোচনায়| দু:খজনকভাবে এই রুটে চিরতরে হারিয়ে গেছেন দুই আল্পাইনিস্ট স্পেনিশ আলবার্তো যেরাইন (৫৫) এবং আর্জেন্টাইন মারিয়ানো গালভান (৩৭)| ১৯ই জুন ডায়ামির বেসক্যাম্প (৪২০০ মিটার) থেকে এই দুইজন যাত্রা শুরু করেন| দ্রুত ৫৬০০ মিটারে পৌঁছে গেলেও বাধসাধে আবহাওয়া| টানা তিনদিন তাঁরা ওই স্থানে আটকে থাকেন| আবহাওয়া ভালো হলে তাঁরা ২৩ই জুন ৫৯০০ মিটারে একরাত কাটান| ২৪ই জুন সাথে থাকা জিপিএস টানা ৬ ঘন্টা ধরে তাঁদের এগিয়ে যাওয়ার সিগন্যাল দিলেও ৬১০০ মিটারে এক জায়গায় তা স্থির হয়ে যায়| টানা ২৪ ঘন্টা চলার পর জিপিএস ডিভাইসটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্দ্ব হয়ে যায় এবং তা আর কখনো চালু হয়নি| এলেক্স গাভানের নেতৃত্বে ২৮ই জুন এবং ১লা জুলাই হেলিকপ্টারের সাহায্যে চিরুনি অভিযান চালিয়েও তাঁদের উদ্বার করা সম্ভব হয়নি| বরং তাঁদের শেষ সিগন্যালের স্থানে পাওয়া গেছে এক ভয়ংকর তুষারধ্বসের চিহ্ন| ধরেই নেয়া যায় এই তুষারধ্বস বিলীন করে দিয়েছে তাঁদের অস্তিত্ব| হারিয়ে যাওয়ার আগে পর্যন্ত যেরাইন ১০টি এবং গালভান ৭টি আটহাজারী শৃঙ্গ আরোহণে সফল হয়েছিলেন|

ছবিঃ যেরাইন ও গালভানের দূর্ঘটনার স্থান
চলুন ঘুরে দেখা যাক ইতিহাসের পাতায় মাজেনো রিজ বধের চেষ্টার গল্প-
১৯৭৯ – প্রথম প্রচেষ্টায় ফ্রেঞ্চ দল
অনেকটাই হঠাৎ করেই করে হয়ে যায় মাজেনো রিজ ধরে নাঙ্গা পর্বত সামিটের প্রথমবারের চেষ্টা| ১৯৭৯ সালে জিয়ান-পিয়েরে ফ্রাসাফন্ড এর নেতৃত্বে ২৩ জন ফ্রেঞ্চ এবং ২ জন পাকিস্তানী পর্বতারোহীর বিশাল দল নাঙ্গা পর্বত অভিযানে যান, যাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল রুপাল ফেস ধরে আরোহন| কিন্তু তাঁরা পৌঁছে দেখতে পান তাদের কাঙ্খিত পথ ভূমিকম্পে তছনছ হয়ে গেছে| তাঁরা ফিরে না এসে পশ্চিম দিকে সরে গিয়ে মাজেনো দিয়ে চেষ্টা করার সিদ্বান্ত নেন| কিন্তু খারাপ আবহাওয়া তাঁদের প্রথম চূড়ার বেশী এগুতে দেয়নি|
ডৌগ স্কট এবং কুর্তাইকা‘র ৮০ এবং ৯০ দশকের ব্যর্থতা
৮০ এবং ৯০ এর দশকে বেশ কয়েকটি দল এই মাজেনো প্রান্ত দিয়ে প্রথম আরোহনের নজির গড়তে অভিযান চালান, যার সবকটিই ব্যর্থ হয়| কিন্তু এই দলে আলাদা হয়ে নাম নেয়া যায় ব্রিটিশ লিজেন্ড স্কট এবং পোলিশ লিজেন্ড কুর্তাইকা’র|
১৯৯২ সালে ডৌগ স্কট এই প্রান্ত আরোহনের লক্ষ্যে প্রথম অভিযান করেন| তাঁর সাথে ছিলেন এলেন হিনকেস, সিয়ান স্মিথ, রাশিয়ান সার্গে এফিমোভ এবং ভেলেরি পার্সিন এবং নেপালের আং পূর্বা ও তেম্বা| কয়েকটি ছোটো-খাটো দুর্ঘটনা এবং তুষারধ্বসের ভয় অভিযাত্রীদের সংখ্যা কয়েকদিনেই নামিয়ে নিয়ে আসে চার্ জনে| স্কট, এফিমোভ, পুর্বা এবং তেম্বা আট দিনের রসদ নিয়ে সামিটের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পরেন| কিন্তু ৬৮৮০, ৬৬৫০, ৬৯৭০ মিটারের তিনটি চূড়া পাড়ি দেয়ার পর তাঁদের ফিরতে হয় সেই যাত্রায়|
১৯৯৩ সালে স্কট আবারো ফিরে আসেন। এবারের সঙ্গী কুর্তাইকা| কিন্তু অভিযান শুরুর আগেই অভিযোজনের সময় তুষারধ্বসে এই ব্রিটিশ আহত হোন এবং অভিযান শুরুর আগেই শেষ হয়ে যায়|
১৯৯৫ সালে স্কট আবারো এক শক্তিশালী দল গঠন করেন| এবার দলে ছিলেন কুর্তাইকা বাদেও রিক এলেন, স্যান্ডি এলেন এবং অস্ট্রেলিয়ান এন্ড্রু লক| কিছুদিন পর স্কট এবং এলেন আর না এগোনোর সিদ্বান্ত নিলে বাকি তিনজন এগিয়ে যেতে শুরু করেন| কিন্তু প্রচণ্ড তুষারপাত অগ্রযাত্রা ব্যাহত করে এবং তৃতীয় চূড়ায় পৌঁছানোর আগেই ফিরে আসতে বাধ্য হোন|
১৯৯৭ সালে কুর্তাইকা সুইস এরহার্ড লোরেটানোকে সাথে নিয়ে ফিরে আসেন| আবারো খারাপ আবহাওয়া তাঁদের ১৯৯২ সালে ছোঁয়া শীর্ষ বিন্দু অতিক্রম করতে দেয়নি|
২০০৪ এবং ২০০৮ – প্রান্তের সমাপ্তি

ছবিঃ মাজেনো গ্যাপের আগে শেষ শৃঙ্গ
অবশেষে ২০০৪ সালে প্রথমবারের মতো এই অবাধ্য প্রান্তের শেষ প্রান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়| যদিও নাঙ্গা পর্বত সামিট রয়ে যায় অধরা| ১২ই আগস্ট হতে ১৮ই আগস্ট পর্যন্ত মাজেনো রিজ আঁকড়ে থেকে শেষ প্রান্তে পৌঁছান ডগ সাবোট এবং স্টিভ সোয়েনসন| অভিযানে তাঁদের সঙ্গী ছিলেন স্টিভ হাউজ এবং ব্রুস মিলার| মাজেনো’র শেষ প্রান্ত যেখানে গিয়ে শেল্ রুটের সাথে মিশে যায় সেখানে গিয়ে খারাপ আবহাওয়ার কারনে এই দু’জন শেল্ রুট দিয়ে নেমে আসেন|
২০০৮ সালে জার্মান জোসেফ লুঙ্গার এবং লুইস ষ্টিজিঞ্জার আবার এই প্রান্ত শেষ করেন| কিন্তু আবারো নাঙ্গা পর্বত সামিট ছাড়াই অভিযান শেষ হয়| আসলে তাঁরা ডায়ামির দিক হতে এপ্রোচ করে এক স্পার দিয়ে এমন এক জায়গায় পৌঁছান যা ছিল বাকি অভিযানগুলোর পৌঁছানো স্থানের চেয়ে ভিন্ন| তাঁরা মেসনারের ১৯৭৮ সালের রুট দিয়ে নেমে আসেন|
২০১২ – প্রথম নাঙ্গা পর্বত শীর্ষে স্যান্ডি এলেন এবং রিক এলেন
ডগ সাবোট এবং স্টিভ সোয়েনসন এর রিজ পাড়ি দেয়ার পর হতে মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় এই রিজ ধরে সামিটে পৌঁছানো| এই মিছিলে যোগ দিয়েছিলেন ২০০৫ সালে জিয়ান ট্রয়লেট, ফ্রেড রক্স, ক্লাউড এবং এলেন গাইল্ল্যান্ড এবং ২০১১ সালে আলবার্তো যেরাইন এবং জিনগো এরিয়েটা| কিন্তু বিভিন্ন উচ্চতা থেকে সবাইকেই ফিরতে হয়|

ছবিঃ মাজেনো রিজ দিয়ে নাঙ্গা শীর্ষে রিক ও স্যান্ডি
অবশেষে এলো ২০১২ সাল| ১৯৯৫ সালে স্কটের সাথে অভিযানের ১৭ বছর পর রিক এলেন এবং স্যান্ডি এলেন ফিরলেন মাজেনো রিজে| সাথে আসলেন দক্ষিণ আফ্রিকার ক্যাথি ও’দৌদ এবং নেপালের লাকপা রাঙডু, লাকপা জারক এবং লাকপা নুরু| ৮ দিনের খাবার সাথে নিয়ে এই ৬ জন ঊর্ধ্বমুখী যাত্রা শুরু করেন যা শেষ হয় ১৮ দিন পর! আরোহন শুরুর কয়েকদিনের মাথায় এক শেরপা ৫০ মিটার নিচে পরে যান| কিন্তু মোটামুটি অক্ষত অবস্থায় তাকে উদ্বার করা হয়| আবারো চলতে শুরু করে পুরো দলই সম্পূর্ণ রিজ পাড়ি দেন| ১৩ দিনের মাথায় রিজের পর মাজেনো গ্যাপ নামক এক জায়গায় যখন পৌঁছান তখন তাঁদের সাথে থাকা সব খাবারই ফুরিয়ে গেছে. খাবার না থাকায় ক্যাথি ৩ শিরোপাকে সাথে নিয়ে বিপদের সাথে লুকোচুরি খেলতে খেলতে নেমে আসেন| আর অন্যদিকে খাবার ছাড়াই এবং শেষ তিনদিন এক ফোঁটা পানি ছাড়াই এক দু:সাহসিক অভিযাত্রা শেষে স্কটিশ রিক এলেন এবং স্যান্ডি এলেন পৌঁছে যান নাঙ্গা পর্বতের শীর্ষে|
…………………………………………………………………………………………………………………

Recent Comments